প্রথম পর্ব কবিতায় -
“দেখিনু পরেতে ওহে, সেই বিশ্বেশ্বর।
মন্দিরের মধ্যে আছে, কেবল প্রস্তর।।
দেখিতে না হয় ভাই, কিছু চমৎকার।
কেবল তাহাতে আছে, কাপট্য আচার।।
পুষ্পদন্ত কেদারেশ, আদি দেবগণ।
নাহি হয় তারা কেহ, নয়ন রঞ্জন।।
কেবল মুর্খেতে ওহে, ভক্তির কারণ।
সাক্ষাৎ ঈশ্বর যেন, করে দরশন।।”
-
রমাসুন্দরী
আমার সঙ্গিনীগণ বেণীঘাটে যায়।
একে একে সকলেতে মস্তক মুড়ায়।।
নাপিতে ধরিয়ে কেশ মাথে দেয় ক্ষুর।
পৈরাগী দাড়ান কাছে সাক্ষাৎ অসুর।।
দেখিয়া ঘৃণিত কাজ অঙ্গ গেল জ্বলে।
আমাকে সকলে মাথা মুড়াইতে বলে।।
অনুরোধ নাহি রাখি না কহি বচন।
-
লক্ষ্মীমণি দেবী
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি এইসময়ের পুরুষ লেখকেরা তীর্থভ্রমণ
লিখছেন। এবং এর আগে এবং পরেও। ঊনবিংশ শতকের পুরুষ ভ্রমণ লেখকদের একটা বড় অংশই লিখেছেন
তীর্থ কাহিনি। তাতে ভ্রমণ কাহিনির রসেরও নিতান্তই অভাব।
ঈশ্বর বিশ্বাসের ধারণাটা বাঙালি মেয়েদের ওপর চাপিয়েছে
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এটা ঐতিহাসিক সত্য। প্রথম পঞ্চাশ বছরে একেবারে শেষ বছরে
অর্থাৎ ১৮৯৯ সালে প্রথম মেয়েদের লেখা তীর্থ ভ্রমণ কাহিনি পাওয়া যায়। তার আগে
তীর্থস্থানে গেছেন তাঁরা, ভ্রমণ কাহিনিও লিখেছেন। নাহ্, তীর্থভ্রমণ নয়।
একশো বছর আগের সংস্কারমুক্ত নারীর গদ্য -
স্বর্ণকুমারী দেবী তাঁর ‘প্রয়াগ যাত্রা’-য় লিখছেন, “মুসলমানদের
এলাহাবাদ অর্থাৎ আল্লার স্থান আর আমাদের পুণ্যতীর্থ প্রয়াগ,- এখানে আসিয়া পবিত্র
গঙ্গা যমুনার সঙ্গমে স্নান করিয়া কত পাপী তাপী তরিয়া গেল, অধম আমার কিছু হইল না,
আমি যে পাপের বোঝা সঙ্গে লইয়া আসিয়াছিলাম – তাহা যেমন তেমনি রহিয়া গেল, এখানে
আসিয়া অবধি আমার একদিন গঙ্গাস্নান হয় নাই। এই শীতের দেশ, ভোরে উঠিয়া গঙ্গাস্নানের
কথা মনে করিতে গেলেও গায়ে কাঁটা দিয়া উঠে, - তবু না হয় এক দিন কষ্টে শ্রষ্ঠে তাহাও
করিব ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু শুনিলাম পাণ্ডাদের কিছু কিছু দিয়া মাথা না মুড়াইতে
পারিলে শুধু গঙ্গাস্নানের ফল হয় না। তা প্রথমটিতে আমার আপত্তি ছিল না, দ্বিতীয়
কথাটি শুনিয়া অবধি এমনি আতঙ্ক উপস্থিত হইয়াছে যে সেই দিন হইতে এই সহজ পুণ্য লাভের
আশাটা একেবারে ছাড়িয়া বিজ্ঞ দার্শনিক হইয়া মনে মনে সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছি – এত
সহজে পাপমুক্ত হইয়া তৃপ্তি নাই”।
স্বর্ণকুমারীর
বড়মেয়ে হিরন্ময়ীর ভাবনাও তদ্রূপ - লেখিকা যেদিন ব্যান্ডেল চার্চে গিয়েছিলেন সেদিন ছিল কনফেশন ডে। একটি মহিলার
কনফেশন পর্ব দেখে লেখিকার মনে বিচিত্র ভাবের উদয় হয়। স্বর্ণকুমারীর সংস্কারমুক্ত
মনের উত্তরাধিকারে তিনি লিখছেন – “মনে হইতে লাগিল, না জানি কোন রমণী কি শোক কি পাপ
তাপে ব্যথিত হইয়া গুরুর আশ্বাস বাণীতে শান্তি লাভ করিতে এখানে আসিয়াছে? আর তুমি
পুরোহিত কে? তুমি কি এই হৃদয়গুলি লইয়া ছেলেখেলা করিতেছ, তোমার আশ্বাসে মুগ্ধ
হইতেছে বলিয়া নির্ব্বোধ ভাবিতেছ, বা ব্যথিতের সঙ্গে অদৃশ্যে তুমিও অশ্রুজল
মিশাইতেছ? হৃদয়ের সহিত তাহাদের শুভ কামনায় আশীর্ব্বাদ করিতেছ? ব্যথিত হৃদয় গুলিতে
সান্ত্বনা বারি সেচন করিয়া তাহাদের নবজীবন দিয়া সংসারে ফিরাইতেছ? কে তুমি
পুণ্যবান, তোমার কি সত্যই এত ধর্ম্ম বল আছে, তুমি যে পাপীদিগকে পাপ হইতে নিষ্কৃতি
দিতে পার?”
প্রথিতযশা সাহিত্যিক গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী দেওঘর বেড়াতে
গিয়ে বৈদ্যনাথের মন্দিরের বর্ণনায় লিখলেন, “
বৈদ্যনাথের মন্দির অনেকটা কালিঘাটের কালীর মন্দিরের মত। মাঝখানে বৈদ্যনাথের
মন্দির, চারদিকে আর চার পাঁচটী দেবালয় আছে, মন্দিরের দালানে একখণ্ড প্রস্তর বসাইয়া
তাহার “কষ্টহরণ” নাম দিয়া পাণ্ডারা বিলক্ষণ পয়সা রোজগার
করিতেছে। পার্ব্বতীর মন্দিরের সহিত শিবের
মন্দিরের চূড়ার সঙ্গে একটী লম্বা সুতা বাঁধা দেখিলাম। জিজ্ঞাসায় জানা গেল, সেটী গাঁটছড়া।
নব-দম্পতীর মধ্যে গাঁটছড়ার নিয়ম আট দিন মাত্র, কিন্তু দেব-দম্পতীর চিরদিন।
তীর্থস্থানমাত্রেই পাণ্ডার উপদ্রব যথেষ্ট থাকিলেও পাণ্ডাদের আচার ব্যবহার মোটের
উপর আমার ভালই লাগে, ইহারা যাত্রীদের আত্মীয়ের মত যথেষ্ট যত্ন আতিথ্য করে,
বাস্তবিক নবাগত দেশে ইহারা বিশ্বস্ত অনুচরের মত, সামান্য অর্থ দিয়া অনেকটা সুবিধা
পাওয়া যায়।”
এরপর জনৈকা গিরিবালা দেবী যিনি ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে
লিখতেন, ওড়িশার পাহাড়-জঙ্গলের মধ্যে এক ভাঙা মন্দিরে পৌঁছে অন্যান্য বর্ণনার সঙ্গে
তার নিজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন - শুনা যায়, এই মহাদেব তিনবর্ণে পরিবর্ত্তিত
হন। প্রাতঃকালে কৃষ্ণবর্ণ, দ্বিপ্রহরে ধূসর বর্ণ এবং সন্ধ্যায় রক্তবর্ণ ধারণ করেন।
আমরা মধ্যাহ্নে মহাদেব দর্শন করিয়াছিলাম তৎকালে ধূসরবর্ণ দেখা গেল। অজ্ঞ লোকের
বিশ্বাস যে ইহাতেই মহাদেবের মাহাত্ম্য অতি প্রত্যক্ষ। কিন্তু একটু অনুধাবন করিয়া
দেখিলে ইহার কারণ স্পষ্টই অনুভূত হয়। মন্দিরের দ্বার পশ্চিমাভিমুখে, সেই জন্যই বোধ
হয় মহাদেবের নাম পশ্চিমেশ্বর। দ্বার হইতে মহাদেবের যে পার্শ্ব দৃষ্ট হয়, তাহা অতি
মসৃণ। সেই মসৃণ পার্শ্বেই সূর্য্যের আভা প্রতিফলিত হওয়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে
উক্তরূপ বিভিন্নবর্ণ দৃষ্ট হয়।”
এইসময়ের মেয়েদের লেখায় ধর্ম, ঈশ্বর, সমাজের প্রতি
দৃষ্টিভঙ্গী অনেক সত্যিকারের আধুনিক এবং বিজ্ঞানমনস্ক। ঈশ্বর নিয়ে সমালোচনা আছে,
এমন কী ব্যঙ্গও। বিশ্বাস, সেতো অনেক পরে তার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া। এগুলো পড়লে মনে হয়
একশ বছরে বাঙালি নারী নিজস্বতা পুরোপুরি হারিয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রভাবে।
এদেরই উত্তরাধিকার বহন করতে চাই আমি।